একীভূত করা হচ্ছে ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজ

বৈশ্বিক আর্থিক খাতে নতুন জায়ান্ট তৈরি করতে চায় চীন

অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়ে আসছে চীন।

অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়ে আসছে চীন। এমন পরিপ্রেক্ষিতে আর্থিক ব্যবস্থাকে আরো সংগঠিত ও প্রতিযোগিতা সক্ষম করতে চাইছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি। এরই মধ্যে ছোট আকারের ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউজের একীভূতকরণে নানা উৎসাহমূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে দেশটিতে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্দেশ্য হলো বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্বকারী শক্তিশালী ব্যাংক ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। এর মধ্যে দিয়ে স্থানীয় অর্থনীতির ভিত্তি আরো মজবুত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজস্ব স্বার্থ আরো ভালোভাবে রক্ষা করা যাবে বলে মনে করছেন দেশটির খাতসংশ্লিষ্টরা। খবর এফটি।

চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির শ্লথগতির অন্যতম কারণ গত কয়েক বছরে রিয়েল এস্টেট খাতের বড় ধরনের পতন। এতে দেশটির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়ে গেছে। ব্যাংক খাতের পুনর্গঠনে রিয়েল এস্টেট খাতের সংকটও যুক্ত। চীনের ন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রেগুলেটরি অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যানুযায়ী, গত এক বছরে দেশটির গ্রামীণ অঞ্চলকেন্দ্রিক প্রায় প্রতি ২০ ব্যাংকের একটি বন্ধ হয়ে গেছে।

ঋণমান সংস্থা এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের তথ্যানুসারে, ২০২৩ সালের শেষ থেকে শুরু করে চলতি সময় পর্যন্ত চীনের সিকিউরিটিজ খাতে বড় ধরনের একীভূতকরণ প্রক্রিয়া চলমান। যেসব প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ খাতটির এক-পঞ্চমাংশের বেশি তারা এ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাংক, সিকিউরিটিজ কোম্পানি ও ব্রোকারেজের মতো প্রতিষ্ঠান আলাদা ও বিচ্ছিন্ন আকারে পরিচালিত হয়ে আসছে। চলমান একীভূতকরণ অভিযানের লক্ষ্য হচ্ছে খণ্ডিত আর্থিক খাতকে কয়েকটি শক্তিশালী ও গতিশীল কোম্পানিতে রূপান্তর করা। এসব প্রতিষ্ঠান জেপি মরগান ও মরগান স্ট্যানলির মতো জায়ান্টের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারবে।

বৃহৎ আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ার বিষয়ে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়েরও নিদের্শনা রয়েছে। তার মতে, বৃহৎ ব্যাংক ও বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান চীনের অর্থনীতিকে আরো এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে। গত মাসে চায়না সিকিউরিটিজ রেগুলেটরি কমিশন বলেছে, ‘একীভূতকরণ ও অধিগ্রহণের মাধ্যমে শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগ ব্যাংকগুলোয় প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে হবে।’

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের চায়না সেন্টারের গবেষণা সহযোগী জর্জ ম্যাগনাসের মতে, দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক পরিবর্তনের দিকে এগোচ্ছে চীন। সে রূপান্তর সামাল দিতে দেশটির প্রয়োজন বৃহৎ ব্যাংক ও ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান। এ ধরনের ব্যবস্থাপনা চীনের ভবিষ্যৎ আর্থিক নীতিগুলো ঠিকভাবে গঠন করতে সাহায্য করবে এবং একই সঙ্গে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ঝুঁকিও কমাবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, একীভূতকরণ প্রক্রিয়ার গতি বেড়ে যাওয়ার পেছনে চীনা কর্তৃপক্ষের এ ধারণা কাজ করছে যে তারা এরই মধ্যে আর্থিক ব্যবস্থার বড় ঝুঁকিগুলো দূর করতে সক্ষম হয়েছে। এখন খাতটিকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা উপযোগী করে গড়ার সময় এসেছে।

এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল রেটিংসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর রায়ান স্যাং বলেন, ‘পুনর্গঠন প্রক্রিয়া কয়েক বছরের নয়, বরং দশকের ব্যাপার হবে। এটি শুধু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা কমানোর ব্যাপার নয়, বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ও বটে।’

গত কয়েক বছর বেইজিংয়ের অর্থনীতি ছিল অতিমাত্রায় ঋণনির্ভর। এখন সে ব্যবস্থার সংস্কার চায় তারা। তাই আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকি কমাতে গ্রামীণ অঞ্চলের অসচ্ছল ব্যাংকগুলো বন্ধ করে দিয়েছে চীনা সরকার। একই সময় এভারগ্র্যান্ডের মতো ঋণগ্রস্ত রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের ওপর বিধিনিষেধ চাপিয়ে দিয়েছে এবং স্থানীয় সরকারকে ঋণ পুনর্গঠন করতে বাধ্য করেছে। বিষয়টি উল্লেখ করে মরগান স্ট্যানলির অর্থনৈতিক বিশ্লেষক রিচার্ড স্যু বলেন, ‘গত এক দশকের তুলনায় বর্তমানে চীনের আর্থিক ব্যবস্থা সবচেয়ে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে। খাতটিকে আরো সরল ও কার্যকর করে তোলার জন্য চাপ প্রয়োগের এখনই সময়।’

বিশ্লেষকরা আশা করছেন, চলতি বছর চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্রোকারেজ, ট্রাস্ট কোম্পানি ও ফাইন্যান্সিয়াল লিজিং গ্রুপগুলোর মধ্যে আরো একীভূতকরণ হবে। কারণ আরো বাহুল্যহীন ও প্রতিযোগিতা সক্ষম আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চান চীন নীতিনির্ধারকরা।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের অংশ হিসেবে চীন এরই মধ্যে ব্যাংকের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমিয়েছে। পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির ৩ হাজার ৬০৩টি গ্রামীণ ব্যাংক মোট ব্যাংক খাতের প্রায় ৯৫ শতাংশ। কিন্তু তারা মাত্র ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ সম্পদ পরিচালনা করে।

ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় প্রতিষ্ঠানগুলো ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গবেষণা সংস্থা ক্রেডিটসাইটসের সিঙ্গাপুর শাখার বিশ্লেষক ক্যারেন উ জানান, চীনে একই রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের অধীনে একাধিক ব্রোকারেজ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে বড় আকারের পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

সাংহাইয়ে স্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ ব্যবস্থাপক সাসাকের অধীনে ছয়টি ব্রোকারেজ রয়েছে। সেখানকার নিয়ন্ত্রকরা চীনের দুটি প্রাচীনতম ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক গুওতাই জুনান ও হাইতং সিকিউরিটিজের মধ্যে একীভূতকরণের জন্য চাপ দিচ্ছে বলে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে গত কয়েক বছর অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে চীন। পরিবর্তনশীল এ পরিবেশের সাড়া দিয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে বেইজিং, যা কিনা চীনের ভূরাজনৈতিক পদক্ষেপের ওপর প্রভাব ফেলছে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক ঋণদান, বেল্ট অ্যান্ড রোড দেশগুলোর ঋণ পুনর্গঠন এবং রেনমিনবির ব্যবহার—এসব আর্থিক সিদ্ধান্তে বেইজিংয়ের প্রত্যক্ষ প্রভাব আরো বাড়বে।

জর্জ ম্যাগনাস বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক এসব কার্যকলাপে মার্কিন আর্থিক ব্যবস্থার মুখোমুখি হবে চীনের অর্থনীতি। তাই প্রতিরক্ষামূলক কৌশল হিসেবে চীনের দিকে থেকে আর্থিক খাতের ক্ষমতায়ন, বৃহৎ ও যৌক্তিক করা একেবারে সংগতিপূর্ণ।’

আরও